সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ক্রিয়াশীল গণতন্ত্র ও শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে দুর্ভিক্ষ হয় না—অমর্ত্য সেন

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ক্রিয়াশীল গণতন্ত্র ও শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে দুর্ভিক্ষ হয় না—অমর্ত্য সেন

Editor’s hands

১৯৯৮ সালে নোবেল কমিটি বাঙালি অর্থনীতিবীদ অমর্ত্য সেনকে কল্যাণমূলক অর্থনীতির প্রবক্তা হিসেবে নোবেল পুরস্কার দেন। অমর্ত্য সেন তাঁর গবেষণা গ্রন্থ ‘পোভার্টি এন্ড ফেমিন’ গ্রন্থে অর্থনীতির জটিল সমীকরণকে পাশ কাটিয়ে মানবিক বিষয়টিকে অর্থনীতির সাথে একীভূত করেছেন। বৃটিশ শাসিত ভারতে ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষ, বাংলায় ৫০ এর মন্বন্তর, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, চীনে ১৯৫৮-৬১ সালের দুর্ভিক্ষ, আফ্রিকার সাব সাহারা অঞ্চলের দুর্ভিক্ষ তাকে এমন ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করেছে।

নোবেল লরিয়েট দেখিয়েছেন দুর্ভিক্ষ কবলিত ঐ সমস্ত দেশে খাদ্য ঘাটতিই যে দুর্ভিক্ষের মূল কারণ ছিল তা নয়; বরং দুর্ভিক্ষ কবলিত দেশে খাদ্য উদ্বৃত্তও দেখা গেছে। তিনি তার গবেষণা গ্রন্থে দেখিয়েছেন,স¦াধীন গণমাধ্যম, সমাজে ক্রিয়াশীল গণতন্ত্র ও শক্তিশালী বিরোধীদলের অভাবে ঐ সমস্ত রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণ কোন দায়বদ্ধতা ও চাপ অনুভব করেননি।

অমর্ত্য সেনের মতে, দেশে দেশে দুর্ভিক্ষের ঐ সময়গুলোতে যদি ক্রিয়াশীল গণতন্ত্র, স্বাধীন গণমাধ্যম ও শক্তিশালী বিরোধীদল থাকত তাহলে এই দুর্ভিক্ষ হতে পারতো না। তিনি জোর দিয়ে বলতে চেয়েছেন-শক্তিশালী বিরোধীদল, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং সমাজে ক্রিয়াশীল গণতন্ত্রই পারে রাষ্ট্র ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় করে তুলতে।
যদিও অমর্ত্য সেনের এই ভাবনা ও নোবেল প্রাপ্তি বাম ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের কাছে পশ্চিমা তোষণ নীতির পারিতোষিক বলে মনে হয়েছে। তবে আমরা অমর্ত্য সেনের এই ব্যাখ্যার যৌক্তিকতা খুঁজে পাই অতীতে দেশে দেশে দায়বোধহীন, জনমত উপেক্ষিত বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সরকারের একরোখা আচরণে। গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে অমর্ত্য সেনের মূল্যায়ন আজকের গণতন্ত্রপন্থী সরকারগুলোর কাছে অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষমতাসীন সরকারের বাহিরের গণতন্ত্রমনা মানুষের কাছে এই মূল্যায়ন ছিল যথার্থ, আজও আছে।

নোভেল করোনা ভাইরাস যার পোশাকি না কোভিড-১৯ পৃথিবীব্যাপী তা-ব চালাচ্ছে। পৃথিবীর দিকে দিকে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে। ক্ষুধার জ্বালায় শিশুদের খাস খাওয়ার সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ও স্যোসাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। শহরের রাস্তায় কুকুর ও মানুষের খাবার ভাগ করে খাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ছে।
আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশেও করোনা হানা দিয়েছে। পুরো দেশ কার্যত লকডাউনের পর্যায়ে চলে গেছে। এই দুর্যোগ মুহূর্তে করোনা মহামারী থেকে বাঁচতে দেশের শ্রমজীবী মানুষকে কাজ ছেড়ে দিয়ে ঘরে ফিরতে বাধ্য করা হয়েছে । তাঁরা এখন বিষণœ-অলস সময় কাটাচ্ছে, নি¤œ আয়ের মানুষও পড়েছে বিপাকে। এক অর্থে সব-শ্রেণি পেশার মানুষই সংকটের মধ্যে পড়েছে। এ অবস্থায় দেশের ১৬ কোটি মানুষের কাছে খাবার পৌছানোর বিষয়টিই এখন মূখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা অভয় দিয়েছেন । তিনি অভয় দিচ্ছেন দেশে প্রচুর খাদ্য মজুদ আছে। আমরা মানি। আমরা মানি আপনার যুগোপযোগী পদক্ষেপে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি আমি আমরা সবাই জানি মহামারি বা কোন দুর্যোগ মুহূর্তে দেশের ব্যবসায়িক শ্রেণি ও মজুদদারদের বিরাট একটা অংশ লোভের বশবতী হয়ে অধিক মুনাফা লাভের আশায় পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে।
দেশের কায়েমি-সুবিধাবাদী-লুটেরা শ্রেণির কিছু মানুষ মজুদদারদের মুনাফায় ভাগ বসায়। এই জরুরি মুহূর্তে, দুর্যোগপূর্ণ সময়ে তথ্য গোপন করার প্রবণতা দেখা যায়। মজুদদার ও লুটেরা শেণি মিলে তথ্য গোপন করে। তথ্য সংগ্রহ ও আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে যদি কোন সীমাবদ্ধতা বা প্রতিবন্ধকতা থাকে তাহলে রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তির কাছে সঠিক তথ্য পৌছানো সম্ভব হয় না, দুর্নীতিবাজ ও মুনাফাখোররা তথ্য সীমাবদ্ধতার সুযোগ গ্রহণ করে। এমতাবস্থায় খাদ্য মজুদ থাকার পরও শুধু তথ্যসীমাবন্ধতার কারণে বিরাট বিপর্যয় ঘটতে পারে। ফলশ্রুতিতে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে।
যে কোন ধরণের দুর্যোগে তথ্যের অবাধ প্রবাহ রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিদের সজাগ রাখে ও আরও বেশি দায়িত্ববান হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। অপরদিকে মুনাফাখোর ব্যবসায়ি ও মজুদদার শ্রেণিকে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিতে বাধা প্রদান করে।

তাই দেশের এই দুর্যোগ মুহূর্তে তথ্যের অবাধ প্রবাহ বজায় রাখতে প্রয়োজনে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের বিশেষ প্রনোদনা দেওয়ার বিষয়টি ভাবা যেতে পারে।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ । এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে গণমানুষের ক্ষমতা, এই নামেই প্রতিফলিত হয়েছে গণমানুষের আশা আকাঙ্খার রূপ ।
নির্দিষ্ট ভূখন্ড, সরকার, সার্বভৌমত্ব ও জনগণ রাষ্ট্রগঠনের মূল উপাদান হলেও রাষ্ট্রের আদর্শিক কাঠামোটি জনগণের কল্যাণ, জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা-এগুলোকে কাঠামো করে দাঁড়িয়ে থাকে। কোন ভাবে এই উপাদানগুলো উপেক্ষিত হলে রাষ্ট্র পরিণত হয় কাঠামোবিহীন ভৌতিক সত্তায়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার প্রতি উদাত্ত আহবান, দেশকে সমষ্টির চোখে দেখবেন। দেশ আপনার দেশ আমার দেশ সকলের।

Share.

Comments are closed.