লালমনিরহাটে তামাক চাষ, সংকুচিত হচ্ছে খাদ্য শষ্য উৎপাদন

লালমনিরহাটে তামাক চাষ, সংকুচিত হচ্ছে খাদ্য শষ্য উৎপাদন

মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাফা লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধিঃ

মাঠের পর মাঠ চাষ করা হয়েছে বিষাক্ত তামাক। যা সুষে নিচ্ছে মাটির গুণাগুন। পড়ছে পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব। ঘটছে স্বাস্থ্যহানীর ঘটনাও। তবে সবকিছু জেনেও স্বপরিবেশে কাজ করছেন তামাক ক্ষেতে। জেলার বিভিন্ন এলাকার চাষীরা বলছেন, শষ্যের দর নির্ধারণ না করা, পর্যাপ্ত সরকারী সহায়তার অভাবসহ অন্য ফসসের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় ক্রমাগত লোকসানের ফলে তামাক চাষে ঝুকছেন তারা। পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও মাটির গুনাগুনের মারাত্মক ক্ষতির বিষয়টি কৃষকরা জেনেও উপস্থিত লাভের আশায় বিষাক্ত তামাক চাষে আগ্রহী হচ্ছেন চাষীরা। এ ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগের উদাসীনতার পাশাপাশি উৎপাদনের আগে কোম্পানী কর্তৃক তামাকের দর নির্ধারণ, বিক্রয়ের নিশ্চয়তা, তামাক চাষের জন্য সুদ মুক্তঋণ বিতরণ, কোম্পানীর প্রতিনিধিদের নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন ও পরামর্শ দান তামাক চাষ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। যা অন্য ফসলের জন্য সরকারীভাবে পান না কৃষক।কৃষি বিশেষজ্ঞরা তামাক কোম্পানীগুলোর লোভনীয় আশ্বাসকে দায়ি করে বলছেন, দেশের মোট উৎপাদিত তামাকের শতকরা ৪০ভাগেই উৎপাদিত হচ্ছে লালমনিরহাটে। অথচ একাধারে কয়েক বছর একইজমিতে তামাক চাষের ফলে মাটির গুণাগুন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে ওই জমি অন্য ফসল চাষের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। আর কোম্পানীগুলোও তখন নতুন এলাকায় আস্তানা করে ফসলী জমিতে তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করে নতুন চাষীদের। এতে সংকুচিত হতে পারে খাদ্য শষ্য উৎপাদনের জমি বলে আশঙ্কা তাদের।
অনুসন্ধানে জানা যায় গেছে, সবজী উৎপাদনের জন্য খ্যাত লালমনিরহাটের মোগলহাট, মেঘারাম এলাকাতেও এবার নতুন করে পরীক্ষামূলকভাবে তামাক চাষ করা হয়েছে। তামাক কোম্পানীগুলো সেখানে আস্তানা বসানোর চেষ্টায় আছে। পাশের কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী এলাকাতেও তারা বেশ সফলতার সাথে আস্তানা করে ফেলেছে। যা দিনে দিনে কৃষি ও কৃষকের জন্য হুমকি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে তামাক চাষে নিরুসাহী করার নির্দেশনা থাকলেও উদাসীন কৃষি বিভাগ। ফলে চাষকার্যে বেড়েছে শিশুদের অবাধ সম্পৃক্ততা। চাষকার্যের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অবাধে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে শিশুদের। এছাড়াও উৎপাদিত এসব তামাক বসতবাড়ির আশপাশে, রাস্তাঘাট, লোকালয় কিংবা জনকোলাহলপূর্ণ স্থানে যত্রতত্র শুকানোর কারণে দুষিত হয় গ্রামীন পরিবেশ। আর তামাকের বিষাক্ত নিকোটিন বাতাসে মিশে গিয়ে নানা রোগে আকান্ত হন সব বয়সী মানুষ। যা প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপনের ওপর ফেলে মারাত্মক প্রভাব। এ অবস্থায় পরিবেশবাদিরা ও তামাক বিরোধী সংগঠনগুলো নানা পরামর্শ দিলেও নিয়ন্ত্রনে নীতিমালা নেই সরকারের।এন্ট্রি টোব্যাকো মিডিয়াএ্যালাইন্স(আত্মা) এর সদস্য এস দিলীপ রায় বলেন, ‘তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আগে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করে একই সময়ে অন্যান্য ফসলগুলো উৎপাদনে সরকারী সহয়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ওই সব ফসলের সরকারীভাবে মূল্য নির্ধারণ করে বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সরকারকেই ভূমিকা রাখতে হবে’। অন্যথায় বেপরোয়া তামাক কোম্পানীগুলোর লাগাম ঠেনে ধরা মুশকিল হবে বলে আশঙ্কা তার।
এদিকে তামার চাষের কারণে দ্বিতীয় খাদ্য গমের উৎপাদন এখন নেই বললেই চলে। ধানও আগের মত অনেক জমিতে উৎপাদন হচ্ছে না। যা কৃষি অর্থনীতির জন্য আগাম হুমকির বার্তাও বটে।এ অবস্থায় কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক বিধু ভূষণ রায়ের গতানুগতিক বক্তব্য ‘তামাক চাষে নিরুৎসাহী করতে তাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে’। যদিও সরকার বর্তমানে সারে যে ভূর্তকি দিচ্ছে সে সুযোগও নিচ্ছেন তামাক চাষীরা।লালমনিরহাট কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর ও খামার বাড়ীর তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ২১ হাজার একর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। যা বাস্তবতায় ৫০ হাজার একরেরও বেশি।তবে এ থেকে পরিত্রানের উপায় হিসেবে প্রতিটি খাদ্য শষ্যের সরকারী দর নির্ধারণ, কৃষকদের পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত ও কৃষি বিভাগেরদায়িত্বশীল ভূমিকার পাশাপাশি তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ণের প্রয়োজনীয়তাকে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

Share.

Comments are closed.