উত্তরাধিকারঃএক পুরুষে করে ধন,এক পুরুষে খায়

আবু সাঈদ.
উপমহাদেশের  রাজনৈতিক সংস্কৃতি  এবং পারিবারিক  পরিমন্ডলে  পূর্ব পুরুষের রেখে  যাওয়া  সুনাম, অর্জিত  সম্পদ  উত্তর পুরুষের বসে  বসে খাওয়া  এবং নষ্ট করার  একটা রেওয়াজ  আছে। বলা বাহুল্য এই  উত্তরাধিকার  সংস্কৃতি কখনো কখনো  উত্তর পুরুষের  সৃজনশীলতা ও মেধাবিকাশের  পথে বড় অন্তরায়  হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের  পারিবারিক  পরিমন্ডলে বাবা  কিংবা দাদাদের জুলুম  নির্যাতন  নিপীড়ন করে   অন্যের  অর্থ  কিংবা  সম্পত্তি  কুক্ষিগত  করে নিজ সন্তানদের  জন্য  রেখে যাওয়ার  ভুরি ভুরি  নজীর  আছে। (আজকাল এটা বেশী বেশী চোখে পড়ার মত) আবার  এমনও নজীর  আছে যে, তাদের রেখে  যাওয়া সম্পত্তির  উপর  তাদের  উত্তরাধিকারীরা শেষ শয্যাটি দিতেও  কার্পণ্য বোধ  করেছেন। এটা পূর্ব পুরুষদের অযাচিত আবেগ, না সন্তানবাৎসল্যতা, না অন্যকিছু  তা  বিচারের  ভার  সমাজবিজ্ঞানিদের, আমরা শুধু  এর নেতিবাচক দিকটি  দেখছি।
পারিবারিক ভাবে বিষয়টির  ক্রিয়া  কিংবা প্রতিক্রিয়া তবু একটা গন্ডির  মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে , কিন্তু  এই অযাচিত আবেগ, এই বাৎসল্যতা  যদি  রাজনীতির বৃহৎ  পরিবেশে প্রয়োগ  করা যায়, তাহলে ভাবুনতো  অবস্থা  কি দাঁড়াবে!
রাজনীতিতে নির্বিচারে উত্তরাধীকার  চর্চা; দুর্নীতি করে, অনিয়ম করে জনগণের সম্পদ, দেশের  সম্পদ  লুটপাট করে  উত্তর পুরুষের  রাজনৈতিক  আসন পোক্ত  করার  রীতিটি  বাংলাদেশের  মত  পৃথিবীর  অন্য কোথাও চোখে  পড়ে না। না,২২ বছরের সফল রাষ্ট্রনায়ক আধুনিক মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠাতা  মাহাথিরের দেশে, না   গণতন্ত্রের  উত্তম  সংজ্ঞাদানকারী  আব্রাহাম  লিংকনের দেশে , না পড়ে গণতন্ত্রের সূতিকাগার গ্রীসে। ভারতে  এটি চোখে  পড়লেও সোনিয়া তনয়  রাহুল গান্ধির রাজনৈতিক পঠন পাঠন, দূরদর্শীতা, দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা  তার উত্তরাধিকারের  প্রশ্নটিকে  আড়াল  করেছে। (আমরা মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রীদের উদাহরণ টানব না)
বাংলাদেশের  রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে  উত্তরাধিকার চর্চার  এ রেওয়াজ  স্বাধীনতা উত্তর  সংকটকালীন সময়ে  চালু  হলেও  গত  এক  দশকে প্রকট  আকার ধারণ  করেছে। এটি অনেকাংশে গণতন্ত্র চর্চার পথকে  রুদ্ধ  করেছে। গণতন্ত্রের আড়ালে ছদ্মবেশী বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র চর্চার পথকে প্রসস্ত করেছে। বলা বাহুল্য আজকের রাজনৈতিক স্থবিরতার পিছনে এই ছদ্মবেশী বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রই অনেকাংশে দায়ী। অনেক মেধাবী  রাজনীতিক এই রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি চর্চার কারণে রাজনীতিতে  আগ্রহ  হারিয়ে ফেলেছেন এবং ফেলছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের  সর্বোচ্চ মেধাবি  ছাত্রটি এখন চাকুরি করতেই বেশী পছন্দ  করেন মেধা-প্রজ্ঞা-শ্রম আর ত্যাগের চর্চা করার উত্তম জায়গা  রাজনীতি ছেড়ে।
এই রীতিটির  চর্চা  শুরু  করেছিলেন মূলত  সাবেক  প্রধানমন্ত্রী  বর্তমান বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম  খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের সফল  রাষ্ট্রনায়ক  জিয়াউর রহমান  তনয়  তারেক  রহমানকে  রাজনীতির  পাঠ  না শিখিয়েই  শুধু  উত্তরাধিকারের দাবীতে হাওয়া ভবন নামে এক ছায়া  সংসদের  ছায়া  প্রধানমন্ত্রী  করে  রাজনৈতিক  দুর্বৃত্তায়নের যে  ছবকটি বেগম  জিয়া তার  সন্তানকে  দিয়েছেন  চোখের  জলে তিনি তার প্রায়শ্চিত্ত  করছেন আজও। জাতি এর কুফল ভোগ  করছে এখনও।বিগত সময়ে দলের  সিনিয়র নেতাদের টপকিয়ে উত্তরাধিকারের  আশীর্বাদ  স্বরূপ  পাওয়া  দলের  সিনিয়র  ভাইস প্রেসিডেন্ট  পদটি  জিয়াউর  রহমানের গড়া  জাতীয়তাবাদী দলটির অখন্ড সত্তায় প্রথম আঘাত  হানে । কর্নেল ওলি,  বদরুদ্দোজা’র মত প্রজ্ঞাবান প্রবীণ  রাজনীতিকরা  এ  উত্তরাধিকার  নীতির  কারণে   দল  থেকে  কেটে  পড়েছেন সে সময়। বলা বাহুল্য দুই বড় দলে  সংস্কার পন্থীদের  আবির্ভাবের পেছনেও  এই  বিতর্কিত   উত্তরাধিকার  নীতিই  দায়ী। যদিও দেশ উদ্ধারের নামে এখন এই বৈরীতা ঢেকে গেছে। দৃশ্যত তারেক জিয়ার  অনুপস্থিতিতে বিএনপি আবারো সংঘবদ্ধ হয়ে উঠছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। এবারে পূর্বের ভুলগুলো শোধরায়ে নিয়ে দলের মধ্যে প্রকৃত গণতন্ত্র চর্চা করলে বিএনপি টিকে যেতে পারে।কারণ,এর প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের উত্থান সমালোচিত হলেও শাসক হিসেবে জিয়াউর রহমান একজন প্রশংসিত ব্যক্তি।তৃণমূলের কাছে বিএনপি’র রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। ব্যাপক অর্থে রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণেও বিএনপির প্রয়োজন অনুভব করছে বাংলাদেশের মানুষ।
বিএনপির উত্তরাধিকার চর্চার রীতিতে সর্বশেষ  বিএনএফ  নামে  ধানের শীষের  বিকল্প শক্তির উত্থান-রীতি ভঙ্গ করে  তারেকের  ‘রাজনৈতিক  আসন পোক্তে’র  কারণ  বলে  বিশিষ্ট জনের অভিমত। যদিও বিএনএফ রাজনৈতিক দল হিসেবে কোন সুবিধা করে উঠতে পারেনি এখনো।
বাংলাদেশে অনেক প্রবীণ ও বিজ্ঞ রাজনীতিক তারেক ও জয়ের তুলনামূলক আলোচনা করে ‘টক শো’তে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। দুজনের মধ্যে তুলনা করেন ও মূল্যায়ন করেন-কে বড়? তারেক, না  জয়। এই তর্ক বিতর্কে ব্যারিষ্টার, প্রফেসর, ইঞ্জিনিয়ার থেকে  শুরু  করে হরতন-রুইতন-চিড়িয়া-টেক্কা  সবাই  আছেন। এই  চাটারের দল সেদিনও  ছিলো, যেদিন  হাওয়া  ভবনের  ফিতা কেটে রাজনীতির  নাবালেক পুত্রটিকে ঢোকানো  হয়। এর পর  সুযোগ বুঝে কেটে  পড়ে, যখন  অন্যায়ের  দায়ে দুর্নীতির দায়ে অপার সম্ভাবনার  অমিত সম্ভাবনার  একটা  তাজা তরুণ  পূর্ব পুরুষের সুনাম  খুঁইয়ে  অকালেই  নষ্ট হয়। কিন্তু  দুর্ভাগ্য  এই চাটারদের চরিত্র  বুঝে  উঠার  ক্ষমতা  আমাদের তরুণ  রাজনীতিকদের নেই।
চাটারদের  চরিত্র  বুঝতে  পারতেন শেরে-এ-বাংলা  এ কে এম  ফজলুল  হক।
হিন্দু জাতীয়তাবাদের  মুখপত্র কোলকাতার  আনন্দবাজার পত্রিকা  নিয়ে  তিনি প্রায়ই মন্তব্য  করতেন, “আনন্দবাজার যেদিন আমার প্রশংসা  করে সেদিন আমি  নিশ্চিত জেনে যাই কোথাও আমার ভুল  হচ্ছে, আবার যেদিন আমার  কাজের নিন্দা করে সেদিন আমি  নিশ্চিত  হই  আমি  ঠিক  কাজটিই  করছি।”
কিন্তু দু:খজনক  হলেও  সত্য আমাদের তরুণ  রাজনীতিকদের  পঠন পাঠন  এবং  দূরদর্শিতার  এত অভাব যে  এরা  প্রশংসা করলে খুশি হয়, শক্র-মিত্র  বুঝে  উঠতে পারে না।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্টাতা বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র হাসিনা তনয়  জয়ের  রাজনীতেতে  প্রবেশের  গুঞ্জন  বেশ জোড়ে শোরে শোনা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে খাবি খেয়েছে এই গুঞ্জন। আমরা তাকে স্বাগত জানাই। আমরা চাইব  গণতান্ত্রিক ধারায়  রাজনীতিতে জয়ের প্রবেশ ঘটুক ধীর পদক্ষেপে। মাটি  ও  মানুষের মনন-মর্জি-মেজাজকে  বুঝে । মায়ের  কিংবা দাদার  অর্জিত  সুনামের খাতিরে নয়।
আসলে পূর্বপুরুষের অর্জিত সম্পদ, সুনাম  ব্যবহারের নেশায়  পড়ে থাকা-আত্মবিকাশের পথকে রুদ্ধ করা,আত্মপ্রবঞ্চনারই  নামান্তর। পূর্বপুরুষের  করা ধন আর সুনামের জন্য বড়াই করা  আর ব্যবহার  করার  মাঝে কোন ক্রেডিড নেই।
সম্পাদক,গোল্ডেনএইজ২৪.কম

Share.

Comments are closed.